সৃজনশীল (CQ)
১. আলিম ও জামিল দুই ভাই। প্রবাসে গিয়ে আলিম প্রচুর সম্পদের মালিক হয়ে দেশে ফিরেছেন। বাড়ি-গাড়ি সবই করেছেন। নিজের সুখের সকল ব্যবস্থাই করেছেন। অপরদিকে জামিল কেবল নিজের সুখ নিয়েই ব্যস্ত নন। পরিবার ও পাড়া প্রতিবেশীর সুখে-দুঃখে তিনি এগিয়ে যান। অন্যের উপকার করার সুযোগ পেলে সুখী হন।
- ক) 'অবনী' শব্দের অর্থ কী?১
- খ) সংসারকে সমর-অঙ্গন বলা হয়েছে কেন?২
- গ) উদ্দীপকের জামিল 'সুখ' কবিতায় বর্ণিত সুখী হবার কোন প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করেছে—ব্যাখ্যা কর।৩
- ঘ) 'আলিমের সুখ প্রকৃত সুখ নয়।'—'সুখ' কবিতার আলোকে মন্তব্যটি বিশ্লেষণ কর।৪
উত্তর দেখুন
ক) 'অবনী' শব্দের অর্থ পৃথিবী।
খ) সংসারকে 'সমর-অঙ্গন' বলা হয়েছে, কারণ জীবন এক কঠিন সংগ্রামের নাম। সুখ ও সাফল্য অর্জনের জন্য মানুষকে বাধা-বিপত্তি ও দুঃখ-কষ্টের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়। ঠিক যেমন একজন যোদ্ধা যুদ্ধক্ষেত্রে সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে লড়াই করে জয়ী হয়, তেমনই মানুষকে জীবনযুদ্ধে আত্মত্যাগ, পরিশ্রম ও দৃঢ় সংকল্পের মাধ্যমে জয়ী হতে হয়। কবি মানুষকে বীরের মতো এ সংগ্রামে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, কারণ প্রকৃত সুখ অর্জনের পথ কখনোই সহজ নয়, বরং তা কঠোর পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের মাধ্যমেই পাওয়া যায়।
গ) উদ্দীপকের জামিল 'সুখ' কবিতায় বর্ণিত সুখী হওয়ার যে প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করেছে, তা হলো পরের জন্য আত্মত্যাগ ও নিঃস্বার্থ সেবা। কবি বলেন, 'পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি, এ জীবন মন সকলি দাও, তার মতো সুখ কোথাও কি আছে? আপনার কথা ভুলিয়া যাও।' অর্থাৎ, প্রকৃত সুখ নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার মধ্যে নয়, বরং অপরের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করাতেই প্রকৃত সুখের স্বাদ পাওয়া যায়। জামিল কেবল নিজের সুখ নিয়েই ব্যস্ত নন, তিনি পরিবার ও পাড়া-প্রতিবেশীর সুখে-দুঃখে এগিয়ে যান। তিনি অন্যের দুঃখে ব্যথিত হন, প্রয়োজনে তাদের পাশে দাঁড়ান, সহায়তা করেন। বিপরীতে, তার ভাই আলিম কেবল নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিয়েই ভাবেন এবং সম্পদ অর্জন করাকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছেন। কিন্তু কবির দৃষ্টিতে এ ধরনের সুখ ক্ষণস্থায়ী ও আত্মকেন্দ্রিক। কবিতায় বলা হয়েছে, 'আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে, সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।' এই চরণ থেকে বোঝা যায়, মানুষ প্রকৃত সুখী হতে পারে তখনই, যখন সে নিজের স্বার্থকে বড় করে না দেখে সমাজ ও অন্যদের কল্যাণে নিয়োজিত হয়। জামিলের জীবনের মূলমন্ত্রও ঠিক তাই। তিনি নিজের স্বাচ্ছন্দ্যকে বড় করে না দেখে অন্যের উপকারে এগিয়ে যান। এই নিঃস্বার্থ সেবাই তাকে প্রকৃত সুখ এনে দিয়েছে, যা কবিতার মূল আদর্শের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়।
ঘ) আলিমের সুখ প্রকৃত সুখ নয়, কারণ তার সুখ কেবল ব্যক্তিস্বার্থে সীমাবদ্ধ, যা 'সুখ' কবিতার আদর্শের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ। কবির মতে, প্রকৃত সুখের মূলমন্ত্র হলো পরের জন্য আত্মত্যাগ করা ও নিঃস্বার্থভাবে অন্যের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা। আলিম অনেক সম্পদ অর্জন করেছেন, বিলাসী জীবনযাপন করছেন, কিন্তু তার এই সুখ একান্তই নিজস্ব, সমাজের জন্য তাতে কোনো উপকার নেই। কবিতায় কবি এমন আত্মকেন্দ্রিক জীবনকে নিরর্থক বলে মনে করেন। তিনি বলেন, 'আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে আসে নাই কেহ অবনী পরে, সকলের তরে সকলে আমরা, প্রত্যেকে আমরা পরের তরে।' এর অর্থ হলো, পৃথিবীতে কেউই শুধু নিজের জন্য জন্ম নেয়নি; প্রকৃত সুখ আসে তখনই, যখন মানুষ নিজেকে ভুলে গিয়ে অন্যের উপকারে আসে। আলিম নিজের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য যা কিছু করছেন, তা সাময়িক তৃপ্তি দিতে পারে, কিন্তু তা প্রকৃত সুখ নয়। প্রকৃত সুখ হলো অপরের জন্য কিছু করা, অন্যের দুঃখ-সুখে পাশে দাঁড়ানো। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে জামিলের জীবন আলিমের তুলনায় বেশি অর্থবহ এবং প্রকৃত সুখের প্রতিনিধিত্ব করে। আলিমের সম্পদ, বিলাসবহুল জীবন, নিজের সুখের আয়োজন—এসবই স্বার্থপরতার প্রতিচিত্র, যা দীর্ঘমেয়াদে মানুষকে তৃপ্ত করতে পারে না। তাই বলা যায়, আলিমের সুখ প্রকৃত সুখ নয়, বরং আত্মকেন্দ্রিক এক ধরনের মোহমাত্র।