বিদেশে পড়াশোনা: পুরো গাইড
বাংলাদেশ থেকে কখন আর কীভাবে যাবেন, কোন দেশে কত GPA আর IELTS লাগে, বছরে কত খরচ, ভিসা আর স্কলারশিপ: সব এক জায়গায়। প্রতিটি তথ্যের সাথে সোর্স দেওয়া আছে; আবেদনের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজের পাতায় মিলিয়ে নিন।
✓ শেষ যাচাই: ২ নভেম্বর ২০২৬
কখন যাওয়া যায়: SSC, HSC না ব্যাচেলরের পর?
SSC-র পর
খুব সীমিত পথ
SSC-র পর সরাসরি বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাচেলর পড়া যায় না, কারণ প্রায় সব দেশে ১২ বছরের পড়াশোনা (HSC বা A-level) লাগে। মালয়েশিয়ার অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান SSC-র পর ফাউন্ডেশন বা ডিপ্লোমায় ভর্তি নেয়, তারপর সেখানেই ব্যাচেলর। বিদেশে হাই স্কুলে পড়ার খরচ অনেক বেশি। বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর জন্য দেশে HSC বা A-level শেষ করে যাওয়াই নিরাপদ আর সস্তা।
HSC-র পর
ব্যাচেলরের জন্য সবচেয়ে প্রচলিত সময়
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, মালয়েশিয়া, চীন, জাপান, কোরিয়া আর হাঙ্গেরিতে HSC দিয়েই ব্যাচেলরে আবেদন করা যায়। যুক্তরাজ্যের অনেক নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আগে ১ বছরের ফাউন্ডেশন লাগে, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ভালো GPA-তে সরাসরি নেয়। জার্মানিতে শুধু HSC দিয়ে সাধারণত সরাসরি ভর্তি হয় না: স্টুডিয়েনকলেগ (১ বছরের প্রস্তুতি কোর্স) করতে হয়, অথবা দেশের স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ বছর পড়ে যেতে হয়।
ব্যাচেলরের পর
সবচেয়ে সহজ, স্কলারশিপও বেশি
মাস্টার্স বা PhD-র জন্য প্রায় সব দেশ খোলা। জার্মানিতে টিউশন প্রায় নেই, যুক্তরাষ্ট্রে রিসার্চ বা টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টশিপে খরচ উঠে যায়, আর Chevening, Commonwealth, DAAD, MEXT, GKS-এর মতো বড় স্কলারশিপ মূলত এই লেভেলে। খেয়াল রাখুন: যুক্তরাজ্য, জার্মানিসহ অনেক দেশ মাস্টার্সে ৪ বছরের অনার্স চায়; ৩ বছরের পাস কোর্স হলে সাথে দেশের মাস্টার্স লাগতে পারে।
দেশ এক নজরে
খরচ বছরে, আনুমানিক টাকায় (open.er-api.com (২ নভেম্বর ২০২৬-এর রেট))। বিস্তারিত যোগ্যতা, ভিসা আর সোর্স দেখতে দেশের নামে চাপ দিন।
| দেশ | HSC-র পর | ব্যাচেলরে HSC GPA | IELTS | টিউশন/বছর | থাকা-খাওয়া/বছর |
|---|---|---|---|---|---|
| যুক্তরাষ্ট্র | হ্যাঁ, সরাসরি ব্যাচেলর | সাধারণত ৩.৫+ | ৬-৬.৫ | ৳১৯-৭৪ লাখ | ৳১৫-২৫ লাখ |
| যুক্তরাজ্য | হ্যাঁ: ফাউন্ডেশন ইয়ার, বা ভালো GPA-তে কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি | সাধারণত ৩.৫+কম হলে: ফাউন্ডেশন ইয়ার | ৬-৬.৫ | ৳২৫-৬৩ লাখ | ৳১৮-২৩ লাখ |
| কানাডা | হ্যাঁ: বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ ডিপ্লোমা | সাধারণত ৪+কম হলে: কলেজ ডিপ্লোমা | ৬-৬.৫ | ৳১৩-৪৪ লাখ | ৳২১-২৭ লাখ |
| অস্ট্রেলিয়া | হ্যাঁ: সরাসরি, বা ফাউন্ডেশন/ডিপ্লোমা হয়ে | সাধারণত ৩.৫+কম হলে: ফাউন্ডেশন বা ডিপ্লোমা | ৬-৬.৫ | ৳১৭-৩৯ লাখ | ৳২৬-৩১ লাখ |
| জার্মানি | সাধারণত সরাসরি নয়: স্টুডিয়েনকলেগ, বা দেশে ১ বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে | সরাসরি নয়কম হলে: স্টুডিয়েনকলেগ বা দেশে ১ বছর পড়া | ৬-৬.৫ | ৳০.৪-৪.২ লাখ | ৳১৬-১৯ লাখ |
| জাপান | হ্যাঁ: ভাষা স্কুল হয়ে, বা ইংরেজি প্রোগ্রামে সরাসরি, বা MEXT | সাধারণত ৩.৫+কম হলে: জাপানি ভাষা স্কুল | ৬-৬ | ৳৪.২-১২ লাখ | ৳৭.৯-১২ লাখ |
| দক্ষিণ কোরিয়া | হ্যাঁ: সরাসরি, বা ভাষা ইনস্টিটিউট হয়ে, বা GKS | সাধারণত ৪+কম হলে: কোরিয়ান ভাষা ইনস্টিটিউট | ৫.৫-৬ | ৳৩.৬-১১ লাখ | ৳৮.১-১৩ লাখ |
| মালয়েশিয়া | হ্যাঁ, সরাসরি ব্যাচেলর | সাধারণত ৩+কম হলে: ফাউন্ডেশন বা ডিপ্লোমা | ৫.৫-৬ | ৳৬.১-১৭ লাখ | ৳৪.৬-৯.২ লাখ |
| চীন | হ্যাঁ: MBBS, ইঞ্জিনিয়ারিং, বিজনেস | সাধারণত ৩+ | ৬-৬ | ৳৩.৭-৮.৪ লাখ | ৳৩.৭-৭.৫ লাখ |
| হাঙ্গেরি | হ্যাঁ, ব্যাচেলর (স্কলারশিপ বা নিজের খরচে) | সাধারণত ৩.৫+কম হলে: নিজের খরচে ভর্তি | ৫.৫-৬ | ৳৪.২-২২ লাখ | ৳৮.৩-১৩ লাখ |
বাংলাদেশ থেকে কীভাবে যাবেন: ধাপে ধাপে
- ১ লক্ষ্য ঠিক করুনকোন বিষয়, কোন লেভেল (ব্যাচেলর না মাস্টার্স), বছরে কত টাকা খরচ করতে পারবেন, আর পড়া শেষে দেশে ফিরবেন নাকি সেখানে কাজ করবেন। এর উত্তর থেকেই দেশ বাছাই সহজ হয়।
- ২ ১২ থেকে ১৮ মাস আগে শুরু করুনপ্রতিটি দেশের ভর্তির সময় (intake) আলাদা: যেমন যুক্তরাষ্ট্র আর যুক্তরাজ্যে মূলত সেপ্টেম্বর, জার্মানিতে অক্টোবর আর এপ্রিল, অস্ট্রেলিয়ায় ফেব্রুয়ারি আর জুলাই। আবেদনের শেষ তারিখ সাধারণত ক্লাস শুরুর ৬ থেকে ১০ মাস আগে।
- ৩ ভাষার পরীক্ষা দিনইংরেজিতে পড়ার জন্য IELTS Academic, TOEFL, PTE বা Duolingo। জার্মান, জাপানি বা কোরিয়ান ভাষায় পড়তে চাইলে সেই ভাষার পরীক্ষা (TestDaF/DSH, JLPT, TOPIK)। ভিসার জন্য অনেক দেশ শুধু নির্দিষ্ট পরীক্ষা নেয় (যেমন যুক্তরাজ্যে UKVI-অনুমোদিত IELTS)।
- ৪ কাগজপত্র গুছিয়ে নিনপাসপোর্ট, SSC ও HSC-র সার্টিফিকেট আর মার্কশিট (প্রয়োজনে শিক্ষা বোর্ড ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সত্যায়ন), ব্যাচেলরের ট্রান্সক্রিপ্ট, SOP (কেন এই বিষয় আর এই দেশ), শিক্ষকদের সুপারিশপত্র (LOR), CV।
- ৫ আবেদন করুন, অফার লেটার নিনবিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট বা দেশের কেন্দ্রীয় পোর্টালে (যেমন UCAS, uni-assist) আবেদন। একসাথে স্কলারশিপেও আবেদন করুন, অনেক স্কলারশিপের শেষ তারিখ ভর্তির আবেদনের আগেই।
- ৬ টাকার প্রমাণ তৈরি করুনটিউশনের প্রথম কিস্তি আর এক বছরের থাকা-খাওয়ার টাকা দেখাতে হয়: ব্যাংক স্টেটমেন্ট, জার্মানির ব্লকড অ্যাকাউন্ট, বা স্পনসরের কাগজ। দেশ থেকে টিউশন পাঠাতে ব্যাংকে স্টুডেন্ট ফাইল খুলতে হয়।
- ৭ ভিসার আবেদনঅনলাইন ফর্ম, ফি, বায়োমেট্রিক (সাধারণত VFS বা দূতাবাসে), কোনো কোনো দেশে ইন্টারভিউ (যেমন যুক্তরাষ্ট্রের F-1)। মিথ্যা কাগজ দিলে ভিসা বাতিল হয়, পরে আবার আবেদনেও সমস্যা হয়।
- ৮ যাওয়ার প্রস্তুতিটিকেট, থাকার জায়গা, স্বাস্থ্যবীমা, প্রয়োজনীয় টিকা, কিছু বৈদেশিক মুদ্রা, আর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রি-ডিপারচার নির্দেশনা।
IELTS আর অন্য পরীক্ষা
| পরীক্ষা | কোথায় লাগে | সাধারণ স্কোর | ফি |
|---|---|---|---|
| IELTS Academic ↗ | ইংরেজির সবচেয়ে প্রচলিত পরীক্ষা; প্রায় সব দেশ নেয় | ব্যাচেলরে সাধারণত ৬.০, মাস্টার্সে ৬.৫ (কোনো ব্যান্ড ৫.৫-৬.০-এর কম নয়) | বাংলাদেশে কম্পিউটার-ভিত্তিক ৳৩১,১০০, UKVI ৳৩৪,৮৫০ (৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে) |
| TOEFL iBT ↗ | যুক্তরাষ্ট্র আর কানাডায় বেশি চলে | সাধারণত ৮০ থেকে ১০০ | ফি ETS-এর ওয়েবসাইটে দেখুন |
| PTE Academic ↗ | অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডায় চলে; ফল দ্রুত আসে | সাধারণত ৫৮ থেকে ৬৫ | ফি Pearson-এর ওয়েবসাইটে দেখুন |
| Duolingo English Test ↗ | অনলাইনে ঘরে বসে; যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় নেয়, ভিসার জন্য অনেক দেশ নেয় না | সাধারণত ১০৫ থেকে ১২০ | ফি Duolingo-র ওয়েবসাইটে দেখুন |
| SAT ↗ | যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাচেলর; অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ঐচ্ছিক, তবে ভালো স্কোরে স্কলারশিপ সহজ | নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪০০+ | College Board-এ দেখুন |
| GRE / GMAT ↗ | যুক্তরাষ্ট্রে মাস্টার্স/PhD (GRE), MBA (GMAT); এখন অনেক প্রোগ্রামে ঐচ্ছিক | প্রোগ্রাম অনুযায়ী | ETS / GMAC-এ দেখুন |
| TestDaF / DSH / Goethe ↗ | জার্মান ভাষায় পড়তে (ইংরেজি প্রোগ্রামে লাগে না) | সাধারণত C1 লেভেল | Goethe-Institut ঢাকায় দেখুন |
| JLPT / NAT ↗ | জাপানি ভাষায় পড়তে বা জাপানি ভাষা স্কুলের জন্য | ভাষা স্কুলে N5-N4, বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত N2 | জাপান দূতাবাসের ঘোষণা দেখুন |
| TOPIK ↗ | কোরিয়ান ভাষায় পড়তে | বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত লেভেল ৩ থেকে ৪ | TOPIK-এর ওয়েবসাইটে দেখুন |
| HSK ↗ | চীনা ভাষায় পড়তে (ইংরেজি মাধ্যমের MBBS-এ লাগে না) | সাধারণত HSK ৪ থেকে ৫ | Chinese Testing International-এ দেখুন |
কোন বিষয়ে কোন দেশ ভালো
CSE, সফটওয়্যার, AI
চাকরির বাজার বড়; যুক্তরাষ্ট্রে STEM হলে OPT-তে ৩ বছর পর্যন্ত কাজ, জার্মানিতে টিউশন ছাড়া মাস্টার্স।
ইঞ্জিনিয়ারিং (EEE, মেকানিক্যাল, সিভিল)
শিল্পকারখানা ও রিসার্চ ল্যাবে হাতে-কলমে কাজ; জাপান-কোরিয়ায় ল্যাবে ফান্ডিং।
মেডিসিন (MBBS)
কম খরচে ইংরেজি মাধ্যম; দেশে ফিরে ডাক্তারি করতে BMDC স্বীকৃতি আর নিবন্ধন পরীক্ষা লাগে। যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যে বিদেশিদের জন্য খুব ব্যয়বহুল ও সিট কম।
বিজনেস, MBA, ফিন্যান্স
যুক্তরাজ্যে ১ বছরের মাস্টার্সে সময় ও খরচ কম; মালয়েশিয়ায় সবচেয়ে কম খরচ।
নার্সিং ও স্বাস্থ্য বিষয়
দক্ষ কর্মীর চাহিদা বেশি, পড়া শেষে কাজের পথ পরিষ্কার।
ডেটা সায়েন্স, পরিসংখ্যান
ছোট মেয়াদের মাস্টার্স (যুক্তরাজ্য) আর কম টিউশন (জার্মানি)।
কৃষি, পরিবেশ, খাদ্য প্রযুক্তি
রিসার্চে স্কলারশিপ (MEXT, DAAD, Stipendium Hungaricum)।
রিসার্চ/PhD (ফান্ডিংসহ)
টিচিং/রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্টশিপ বা বেতনসহ PhD পদ।
কম বাজেটে পড়া
টিউশন নেই বা কম, আর সরকারি স্কলারশিপের সুযোগ।
বড় স্কলারশিপ
টাকা দেওয়ার আগে সাবধান
- এজেন্সির কথায় নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজের ওয়েবসাইট থেকে যোগ্যতা, ফি আর শেষ তারিখ মিলিয়ে নিন।
- "টাকা দিলে IELTS সার্টিফিকেট" বা "ভিসা নিশ্চিত" প্রতারণা। জাল কাগজ ধরা পড়লে বহু বছরের জন্য সেই দেশে আবেদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
- প্রতিষ্ঠানটি সরকারি তালিকায় আছে কিনা দেখুন: যুক্তরাজ্যে স্টুডেন্ট স্পনসর তালিকা, কানাডায় DLI তালিকা, অস্ট্রেলিয়ায় CRICOS, জার্মানিতে anabin, চীনের MBBS-এ BMDC তালিকা।
- ভিসার টাকার প্রমাণ সত্যি হতে হবে; ধার করা টাকা কয়েক দিনের জন্য দেখিয়ে আবার তুলে নিলে ভিসা বাতিল হতে পারে।
- খরচের হিসাবে শুধু টিউশন নয়: থাকা-খাওয়া, স্বাস্থ্যবীমা, ভিসা ফি, বিমান ভাড়া আর প্রথম কয়েক মাসের বাড়তি খরচও ধরুন।
এই পাতার তথ্য সরকারি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত পাতা থেকে নেওয়া, প্রতিটি দেশের পাতায় সোর্স দেওয়া আছে। ফি, টাকার পরিমাণ আর ভিসার নিয়ম প্রায়ই বদলায়; আবেদনের আগে অফিসিয়াল পাতায় মিলিয়ে নিন। টাকার হিসাব আনুমানিক রেটে।