সৃজনশীল (CQ)
১. দাড়িয়াপুর গ্রামের রহিমা দরিদ্র হলেও শিল্পী মনের অধিকারী। ছোটবেলা থেকেই সে বাঁশ ও বেত দিয়ে সংসারের প্রয়োজনীয় অনেক জিনিস তৈরি করত। কিন্তু আচমকা একদিন তার স্বামী মারা গেলে দুই সন্তান নিয়ে সে পথে বসে। রহিমা উপায়ান্তর না দেখে অবশেষে সুই-সুতা হাতে তুলে নেয়। সে তার সুখ-দুঃখের জীবনকে দীঘল সুতার টানে ভাষা দিতে থাকে। একদিন বেসরকারি একটি সংস্থার মাধ্যমে তার সুচিশিল্পগুলো বিদেশে যায় এবং মোটা অঙ্কের অর্থ প্রাপ্তির পাশাপাশি সে প্রচুর সুনাম অর্জন করে।
- ক) কোন এলাকার 'মাদুর' সকলের কাছে পরিচিত?১
- খ) 'ঢাকাই মসলিনের কদর ছিল দুনিয়া জুড়ে'—বলতে কী বোঝানো হয়েছে?২
- গ) স্বামীর মৃত্যুর পর রহিমার কাজটি 'আমাদের লোকশিল্প' প্রবন্ধে কীসের প্রতিনিধিত্ব করে? বর্ণনা কর।৩
- ঘ) দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে রহিমার অবদান 'আমাদের লোকশিল্প' প্রবন্ধের আলোকে মূল্যায়ন কর।৪
উত্তর দেখুন
ক) খুলনার মাদুর সবার কাছে পরিচিত।
খ) 'ঢাকাই মসলিনের কদর ছিল দুনিয়া জুড়ে'—বলতে বোঝানো হয়েছে যে, ঢাকাই মসলিন কাপড় একসময় বিশ্বব্যাপী খুবই জনপ্রিয় ছিল এবং এর অসাধারণ মানের জন্য এটি পৃথিবীর নানা জায়গায় প্রশংসিত ছিল। মসলিন ছিল অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং নরম কাপড়, যা মোগল বাদশাহদের বিলাসিতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এর সূতা এত সূক্ষ্ম ছিল যে, খুব সহজেই তা ছোট একটি আংটির ভিতর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারতো, এবং এটি শিল্পগুণের দিক থেকেও অতুলনীয় ছিল। তাই ঢাকাই মসলিন শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীজুড়ে সমাদৃত এবং প্রিয় ছিল।
গ) উদ্দীপকে বর্ণিত রহিমার কাজটি 'আমাদের লোকশিল্প' প্রবন্ধে হস্তশিল্পের প্রতিনিধিত্ব করে।
এই প্রবন্ধে বর্ণিত বিভিন্ন লোকশিল্পের মধ্যে, বিশেষত কুটিরশিল্প এবং হস্তশিল্পের গুরুত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে একদিকে মানুষের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, জীবনের অভিজ্ঞতা এবং সৃজনশীলতা মিশে থাকে, অন্যদিকে তা অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রহিমা তার জীবনের দুর্বিষহ মুহূর্তে, যখন স্বামীর মৃত্যু তাকে শূন্য করে দিয়েছিল, তখন তার হাতের সেলাইয়ের মাধ্যমে নিজেকে এবং তার জীবনকে নতুনভাবে গড়ে তোলে। সে নকশিকাঁথার সেলাইয়ে একে একে জীবনের সুখ-দুঃখ, তার শোক ও সংগ্রামের গল্প তুলে ধরে।
এছাড়া, নকশিকাঁথা তৈরির মাধ্যমে রহিমা একটি প্রাচীন ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছিল, যা বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে এক সময় বিশেষভাবে প্রচলিত ছিল। নকশিকাঁথা শুধু একটি সাধারণ বস্তু ছিল না, বরং প্রতিটি সূচের ফোঁড়ের মধ্যে লুকিয়ে ছিল এক একটি জীবনের কাহিনি, সমাজের চিত্র এবং মানুষের আবেগের প্রকাশ।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে, রহিমার কাজটি 'আমাদের লোকশিল্প' প্রবন্ধে হস্তশিল্পেরই এক উজ্জ্বল উদাহরণ, যেখানে কেবল দক্ষতা নয়, শিল্পের মাধ্যমে মানুষের মনোভাব, অভ্যন্তরীণ যন্ত্রণাও ফুটে ওঠে।
ঘ) রহিমার নকশিকাঁথা তৈরি শুধু তার ব্যক্তিগত জীবনে পরিবর্তন আনেনি, বরং তার কাজ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে একটি বড় অবদান রেখেছে।
'আমাদের লোকশিল্প' প্রবন্ধে যে কুটিরশিল্প ও হস্তশিল্পের কথা বলা হয়েছে, তা দেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে প্রমাণিত হতে পারে। একদিকে যেখানে গ্রামীণ জনগণের জীবিকা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে এসব শিল্প রয়েছে, অন্যদিকে এই শিল্পের আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবর্তনও দেশের অর্থনীতির জন্য উপকারী হতে পারে। রহিমার সৃষ্ট নকশিকাঁথা বিদেশে বিক্রি হওয়ার মাধ্যমে তার নিজের জীবনে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এসেছে এবং বাংলাদেশে লোকশিল্পের প্রতি বিদেশি আগ্রহও বেড়েছে।
তবে এর চেয়ে বড় কথা, রহিমার কাজ একটি উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, গ্রামীণ সমাজের মানুষের যদি সঠিক প্রশিক্ষণ ও সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে তারা শুধু নিজেদের জীবনকে পরিবর্তন করতে পারে না, বরং দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখতে পারে। আজকের দিনে, যখন দেশের অনেক গ্রামীণ অঞ্চলে কর্মসংস্থান ও আর্থিক সুযোগ কম, তখন এ ধরনের লোকশিল্পকে একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এই শিল্পের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব এবং একে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি দেয়া গেলে, বিদেশী বাজারেও দেশের শিল্পের মান বৃদ্ধি পাবে। সুতরাং, রহিমা তার নকশিকাঁথা তৈরির মাধ্যমে শুধু নিজেকে নয়, দেশের অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন, যা 'আমাদের লোকশিল্প' প্রবন্ধে বর্ণিত শিল্পের বৈশিষ্ট্য এবং তা থেকে প্রাপ্ত উপকারিতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।