সৃজনশীল (CQ)
১. শহরের মেয়ে দীপা তার নানাকে নিয়ে নানা বাড়ির গ্রাম দেখতে বের হয়। তার নানা প্রথমে তাকে একটা অবস্থাপন্ন পরিবারে নিয়ে যান। এ পরিবারে তার বয়সী মেয়েরা সালোয়ার-কামিজ পরে, ঠোঁটে লিপস্টিক দেয়, হাতে চুড়ি ও কানে স্বর্ণের দুল পরে। গৃহিণীরা তাঁতের শাড়ি পরে এবং শাড়ির আঁচল টেনে ঘোমটা দেয়। তাঁদের হাতে ও গলায় স্বর্ণালংকার শোভা পাচ্ছে। এ বাড়ি পেরিয়ে দীপা এক দিনমজুরের খড়ের তৈরি ঝুপড়ি ঘরে ঢুকে পড়ে। দিনমজুরের স্ত্রীর পরনে মলিন শাড়ি, সন্তানদের পরনে ছেঁড়া হাফপ্যান্ট এবং শরীরের রুগ্ণ দশা দেখে দীপার খুব মনঃকষ্ট হয়। সে ভাবে, শত শত বছর চলে যায়, কিন্তু এদেশের দরিদ্র মানুষের জীবনের অভাবগুলো আর চলে যায় না।
- ক) বাংলাদেশের ইতিহাস কত বছরের পুরোনো?১
- খ) ইতিহাস বলতে বোঝায় সব মানুষের কথা-ব্যাখ্যা কর।২
- গ) দীপার দেখা গ্রামের লোকজনের পোশাক-পরিচ্ছদের সাথে হাজার বছর আগের পূর্বপুরুষদের পোশাকের যে মিল পাওয়া যায় তা বর্ণনা কর।৩
- ঘ) 'শত শত বছর চলে যায়, কিন্তু এদেশের মানুষের জীবনের অভাবগুলো চলে যায় না।'—উদ্দীপক এবং 'কত কাল ধরে' প্রবন্ধের আলোকে ব্যাখ্যা কর।৪
উত্তর দেখুন
ক) বাংলাদেশের ইতিহাস প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরোনো।
খ) 'ইতিহাস বলতে বোঝায় সব মানুষের কথা'—এখানে লেখক বলছেন যে, ইতিহাস শুধু রাজা-রাজড়াদের বা ক্ষমতাধরদের কাহিনী নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, সংগ্রাম, আনন্দ-দুঃখও ইতিহাসের অংশ। প্রাচীন বাংলার সাধারণ মানুষের চাষাবাদ, ঘর বাঁধা, সমাজ পরিচালনা ইত্যাদি বিষয় ইতিহাসের অঙ্গ। অর্থাৎ, ইতিহাসে শুধু ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, জনগণের জীবনের প্রতিফলনও গুরুত্বপূর্ণ, যা সময়ের সাথে আমাদের জানা হয়ে ওঠে।
গ) উদ্দীপকে দীপা যে গ্রামের লোকজনের পোশাক-পরিচ্ছদ দেখেছিল, তার সাথে 'কত কাল ধরে' প্রবন্ধে বর্ণিত হাজার বছর আগের পূর্বপুরুষদের পোশাকের মধ্যে বেশ কিছু মিল লক্ষ করা যায়। প্রাচীন বাঙালি সমাজে মেয়েরা শাড়ি পরত এবং আঁচল টেনে ঘোমটা দিত, যা দীপার দেখা গ্রাম্য গৃহিণীদের পোশাকের সাথে একেবারে মিলে। সেই সময়ও সচ্ছল পরিবারের মহিলারা শাড়ির সঙ্গে সোনার অলংকার পরতেন, যেমনটি দীপা দেখেছে গ্রামের অবস্থাপন্ন পরিবারের গৃহিণীদের মধ্যে। আবার সাধারণ দরিদ্র মানুষের পোশাক ছিল সাদামাটা; দীপার দেখা দিনমজুরের স্ত্রীর মলিন শাড়ি ও সন্তানদের ছেঁড়া হাফপ্যান্ট তারই প্রতিচ্ছবি। সুতরাং, এই পোশাক-পরিচ্ছদে হাজার বছরের ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও এক ধরনের ধারাবাহিকতা এবং অপরিবর্তিততার চিত্র ফুটে ওঠে, যা সমাজের স্তরগত বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে চিন্তা করতে বাধ্য করে।
ঘ) উদ্দীপক এবং 'কত কাল ধরে' প্রবন্ধের আলোকে বলা যায় যে, 'শত শত বছর চলে যায়, কিন্তু এদেশের মানুষের জীবনের অভাবগুলো চলে যায় না।'—উক্তিটি যথার্থ। উদ্দীপকে দীপা যখন তার নানাকে নিয়ে গ্রাম দেখতে যায়, তখন সে দুটি ভিন্ন সমাজের চিত্র দেখতে পায়—একটি সচ্ছল পরিবার এবং একটি দিনমজুরের পরিবার। সচ্ছল পরিবারে গৃহিণীদের পরনে তাঁতের শাড়ি ও স্বর্ণালংকার এবং মেয়েদের পরনে সালোয়ার-কামিজ, কানে স্বর্ণের দুল, যা তাদের আর্থিক সচ্ছলতার প্রতীক। অন্যদিকে, দিনমজুরের পরিবারের সদস্যরা ছিল হতদরিদ্র, তাদের পোশাক ছিল মলিন এবং শরীর ছিল রুগ্ণ। দীপা এই দৃশ্য দেখে বুঝতে পারে, শত শত বছর চলে গেলেও দেশের দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রায় কোনো পরিবর্তন আসেনি। তাদের অভাব, দারিদ্র্য এবং সমস্যাগুলো একেবারেই অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। এখন, 'কত কাল ধরে' প্রবন্ধেও লেখক বাংলার হাজার বছরের ইতিহাসে মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা করেছেন। সেখানে দেখা যায়, প্রাচীন বাংলায়ও ধনী-গরিবের বৈষম্য ছিল এবং সাধারণ দরিদ্র মানুষের জীবন ছিল অভাব-অনটনে ভরা। পুরানো সময়ের সাধারণ মানুষের জীবন ছিল দারিদ্র্যে পরিপূর্ণ এবং সেই দারিদ্র্য আজও পরিবর্তিত হয়নি। তারা যে পোশাক পরত, খাদ্য গ্রহণ করত, এবং জীবনযাত্রার যে সীমাবদ্ধতা ছিল, তা আজও অনেকাংশে অটুট রয়ে গেছে। এভাবে, উক্তি 'শত শত বছর চলে যায়, কিন্তু এদেশের মানুষের জীবনের অভাবগুলো চলে যায় না'—এক ধরনের হতাশার প্রতিফলন, যা দীপা এবং প্রবন্ধের মাধ্যমে আমরা অনুভব করি—এ দেশে যত উন্নয়নই হোক, দরিদ্র মানুষের সমস্যা এবং অভাবের চিত্র শতাব্দী ধরে অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।